রিয়া লোক দেখানোর মানসিকতা এক মারাত্মক ব্যাধি। এর কারণে মানুষের ভালো কাজ ও ইবাদত নষ্ট হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের সদকাকে সেই ব্যক্তির মতো নষ্ট করো না, যে নিজের সম্পদ মানুষকে দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে না। তার উদাহরণ হলো একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর কিছু মাটি জমেছিল। এরপর যখন সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হলো, তখন তা সেই পাথরটিকে একদম পরিষ্কার ও শক্ত করে রেখে দিল। অর্থাৎ, এমন লোকদেখানো আমলকারীদের উপার্জনের কোনো অংশই তাদের উপকারে আসবে না। আর আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথ দেখান না। (সূরা আল-বাকারা)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সওয়াবের আশায় না করে শুধু নামডাক ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, তার কোনো মূল্য নেই। সেই আমল পুরোপুরি ব্যর্থ ও বাতিল। ঠিক একইভাবে, দান-সদকা করার পর যদি কাউকে খোঁটা দেওয়া হয় বা যাকে দান করা হলো তাকে কষ্ট দেওয়া হয়, তবে সেই দানের সওয়াব থেকেও মানুষ বঞ্চিত হয়।
মানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার উম্মতের বিষয়ে এই ব্যাধিটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ও শঙ্কিত ছিলেন। উম্মাহ যেন এই ধ্বংসাত্মক অভ্যাসে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য তিনি তার বিভিন্ন বাণীতে এর ভয়াবহতা ও কুফল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
সহিহ মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে হাজির করা হবে। তাদের মধ্যে প্রথমজন হবেন একজন শহীদ। আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়াতে দেওয়া সব নেয়ামতের কথা স্মরণ করাবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। এরপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, এই নেয়ামতগুলোর বিনিময়ে তুমি দুনিয়াতে আমার জন্য কী করেছ? সে বলবে, আমি তোমার পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছি।
তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি তো এই উদ্দেশ্যে জীবন দিয়েছিলে যেন মানুষ তোমাকে বীর ও সাহসী বলে। আর দুনিয়াতে তোমাকে তা বলাও হয়েছে। এরপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দেওয়া হবে তাকে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য।
দ্বিতীয় ব্যক্তি হবে একজন আলেম ও কারী। আল্লাহ তাকেও দুনিয়ার নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করাবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, এই নেয়ামতগুলোর বদলে তুমি আমার জন্য কী করেছ? সে উত্তর দেবে, আমি দ্বীনি এলেম শিখেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেছি ও শিক্ষা দিয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি এলেম অর্জন করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে আলেম বলে, আর কোরআন পড়েছিলে যেন মানুষ তোমাকে কারী বলে। দুনিয়াতে মানুষ তোমাকে তা বলেছে। এরপর তাকেও ফেরেশতারা টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে ফেলে দেবে।
সর্বশেষ হাজির করা হবে একজন দানশীল ব্যক্তিকে। আল্লাহ তাকেও তার দেওয়া নেয়ামতগুলোর কথা মনে করিয়ে দেবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। আল্লাহ জানতে চাইবেন, তুমি এর বিনিময়ে কী আমল করেছ? সে বলবে, হে প্রভু, তুমি যেসব খাতে দান করা পছন্দ করো, তার একটিও আমি বাদ দিইনি, তোমার সৃষ্টির কল্যাণে আমার সব ধন-সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি তো দান করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে দাতা ও দানবীর বলে। দুনিয়াতে তোমাকে তা বলা হয়ে গেছে। এরপর তাকেও একইভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, শুধু সেই ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, যা খাঁটি মনে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। পক্ষান্তরে, যে ইবাদত আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের জ্বালানি ছাড়া আর কিছুই হবে না।
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ১৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করছে, আর আল্লাহ তাদের সেই প্রতারণার শাস্তি দেবেন। তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অত্যন্ত অলসতার সাথে দাঁড়ায়। তারা শুধু মানুষকে দেখায় এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।
একইভাবে, নামাজে অলসতা ও উদাসীনতা প্রদর্শনকারী লোক দেখানো ব্যক্তিদের জন্য ধ্বংসের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-মাউনে আল্লাহ বলেন, ধ্বংস সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন এবং যারা লোকদেখানো কাজ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জানাব না, যা আমার দৃষ্টিতে তোমাদের জন্য দাজ্জালের ফেতনার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক? সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, তা হলো গোপন শিরক। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়তে দাঁড়াল, আর কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে তার নামাজকে আরও সুন্দর ও দীর্ঘ করল। (ইবনে মাজাহ)
অর্থাৎ, যারা নামাজের সঠিক যত্ন নেয় না, আদায়ে অলসতা করে এবং শুধু মানুষের মাঝে থাকলে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে, কিন্তু একা থাকলে বা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে নামাজের কোনো গুরুত্ব দেয় না, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
কোরআন মাজিদের আরেকটি স্থানে লোক দেখানোকে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে মুমিনদের তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-আনফালের ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তোমরা তাদের মতো হইয়ো না, যারা অহংকার করে এবং মানুষকে দেখানোর জন্য নিজেদের ঘর থেকে বের হয়েছিল।
যেহেতু রিয়াকারি কাফের ও মুনাফিকদের চরিত্র, তাই একে এক ধরনের শিরক বা অংশীদারিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সূরা কাহফের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অতএব যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে। এখানে সৎকর্ম বলতে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করাকে বোঝানো হয়েছে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, যেকোনো আমল কবুল হওয়ার দ্বিতীয় প্রধান শর্ত হলো তা ইখলাস বা খাঁটি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। এই আয়াতে শরিক না করার অর্থ হলো লোকদেখানো মানসিকতা বা রিয়া থেকে মুক্ত থাকা, যা বিভিন্ন তাফসিরেও সমর্থিত হয়েছে।
রিয়াকারি ও সুনামের আকাঙ্ক্ষা মূলত ছোট শিরক, যা মানুষের আমলকে ধ্বংস করে দেয়। এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা হলো ছোট শিরক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, রিয়াকারি বা লোকদেখানো আমল। (মুসনাদে আহমাদ)
অন্য একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উম্মতের শিরকে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তখন জানতে চাওয়া হয়, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার পর কি আপনার উম্মত মূর্তি পূজায় লিপ্ত হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে তারা চন্দ্র, সূর্য, পাথর বা মূর্তির পূজা করবে না, বরং তারা লোকদেখানোর জন্য নেক আমল করবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জানাব না, যা আমার দৃষ্টিতে তোমাদের জন্য দাজ্জালের ফেতনার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক? সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, তা হলো গোপন শিরক। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়তে দাঁড়াল, আর কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে তার নামাজকে আরও সুন্দর ও দীর্ঘ করল। (ইবনে মাজাহ)
আমলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই গোপন শিরককে মহানবী (সা.) উম্মতের জন্য দাজ্জালের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে দেখিয়েছেন। জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম গ্রন্থের এক হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি দেখানোর জন্য নামাজ পড়ল সে শিরক করল, যে দেখানোর জন্য রোজা রাখল সে শিরক করল এবং যে দেখানোর জন্য দান করল সেও শিরক করল।
মূল কথা হলো, লোক দেখানোর জন্য করা আমল সরাসরি শিরকের শামিল। কোনো মানুষ যদি নামাজ, রোজা বা যেকোনো ভালো কাজ লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে করে, তবে সে আল্লাহর সাথে অন্যকে অংশীদার বানাল। আর আল্লাহ তায়ালা অংশীদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে আমলে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা হয়, আল্লাহ তা কখনোই কবুল করেন না।
খুলনা গেজেট/রুএ

